জীবন দিয়ে হলেও বিশুদ্ধ পানি আদায় কবর

হৃদয় আলম: রাজধানীর পূর্ব জুরাইন এলাকা থেকে ওয়াসার পানি নিয়ে সেবা সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) শরবত পান করাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন কয়েকজন। সেদিন ২৩ এপ্রিল ওয়াসা কর্তৃপক্ষ আগতদের উদ্দেশে বলেন, ওই এলাকার পানি ভালো করে দিয়ে শরবত খেয়ে আসবেন কর্মকর্তারা।

কিন্তু এখন পর্যন্ত জুরাইন এলাকায় ওয়াসার পানির লাইন ঠিক করে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন মিজানুর রহমান, যিনি শরবত খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

তিনি বিডি২৪লাইভকে বলেন, আজ (৩০ এপ্রিল) পর্যন্ত কোন ওয়াসার কোন কর্মকাণ্ড আমাদের চোখে পড়েনি। আমার মনে হয় বড়সড় কোন আন্দোলন ছাড়া আমরা সমাধান পাবোনা। আমরা এলাবাসীরা বিষয়টা নিয়ে খুবই চিন্তিত। ‘শরবত কাণ্ডে’র পর দিন আমার বাসায় এসে কিছু লোক হুমকি দেওয়ার পর থেকে আমি কিছুটা ভীত। যদিও ওইদিনের পর আর কেউ কিছু বলেননি।

আমরা সামনে সমাধান না পেলে এলাকাবাসীরা একত্রে আন্দোলন করব। আমরা বৃহৎ পরিসরে কিছু করার কথা ভাবছি। আমরা এলাকাবাসী মিলে এরই মধ্যে একটা সংগঠনের কথাও ভাবছি যেটা আমাদের সত্যের পথে কাজ করবে। কিছুদিনের মধ্যে সুষ্ট সমাধান না হলে আমরা সাংগঠনিকভাবে এই সংগঠনের মাধ্যমে আন্দোলনসহ অন্যান্য কর্মসূচির কথা ভাবছি।

এক প্রশ্নের জবাবে মিজান বলেন, ‘পূর্ব জুরাইনের যেসব এলাকার পানি বেশি খারাপ ‘বিষের মতো’। আমি ওইসব এলাকায় জিজ্ঞেস করলাম ওয়াসার কোনো কর্তৃপক্ষ আপনাদের যোগাযোগ হয়েছে কি না? উনারা বললেন, না কোনো রকম যোগাযোগ হয়নি। এ অবস্থায় তারা একটি ভয়াবহ জীবনযাপন করছে।’

যেদিন শরবত পান করাতে ওয়াসা ভবনে গিয়েছিলেন, সেদিন আপনাদের কী বার্তা দেওয়া হয়িছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে মিজানুর রহমান বলেন, ‘সেদিন ওয়াসা কর্তৃপক্ষ আমাদের বিশ্বাস করেনি। আমরা পূর্ব জুরাইন থেকে ওয়াসার পানি নিয়ে গিয়েছিলাম শরবত পান করানোর জন্য।

কিন্তু তারা শরবত পান করেনি। আমরা যে পানি নিয়ে গিয়েছিলাম, সে পানি নাকি ওয়াসার না, এমন কথা বলেছেন তারা। আবার তারা স্বীকার করেছেন, পানি ভালো করে দিয়ে শরবত খেয়ে আসব। কিন্তু আজ পর্যন্ত পানির লাইন ঠিক করেনি। শরবতও পান করেনি ওয়াসার লোকেরা।’

মিজান বলেন, ‘আমরা সেদিন তাদের কাছে (ওয়াসা) ঠিকানা দিয়েছিলাম। কিন্তু সে ঠিকানা অনুযায়ী তারা কাজ করেনি। এলাকার মানুষ জীবন দিয়ে হলেও বিশুদ্ধ পানি আদায় করে ছাড়বে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘শরবত কাণ্ডে’র অন্যতম সক্রিয় সদস্য মনিরুল ইসলাম ফরাজী বিডি২৪লাইভকে বলেন, আমরা সেইদিন ছিলাম পাঁচজন। আজ আর আমরা পাঁচজন নেই। গোটা দেশ আমাদের সমর্থন জানিয়েছে।

আমাদের সাথে এখন রয়েছে দেশের মানুষ। ওয়াসার অত্যাচারে সবাই ক্ষিপ্ত। আমরা কোন প্রতিকার না পেলে অবশ্যই অন্য কিছু করার কথা ভাবছি। প্রশাসনের লোক সব জানার পরেও ব্যবস্থা নেয়না। কারণ ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’। সমাধান আমাদের সবার কাম্য। সমাধান দেশের মানুষের কাম্য।

তিনি বলেন, ‘রাজধানীর কোথায়ও শতভাগ সুপেয় পানি নেই। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান যে কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়েছেন তাঁর সেই বক্তব্য শুধুমাত্র রাজধানীবাসী নয় পুরো দেশবাসীই প্রত্যাখান করেছে। তার বক্তব্য অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করতে হবে এবং তাঁকে জনগনের কাছে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ওয়াসার অব্যবস্থাপনার কারণে এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি পুরো রাজধানীবাসীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। যার প্রতিক্রিয়া আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত খবর এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত কমেন্টগুলো দেখলেই বুঝতে পারি।’

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি রয়েছে বলে মনে করেন মনিরুল ইসলাম ফরাজী। তিনি বলেন, আমি মনে করি ওয়াসায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। যার কারণে ওয়াসার বর্তমান কাজ ও মানের বাজে অবস্থা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাই অবিলম্বে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ প্রেক্ষিতের কথা হয় ওয়াসার প্রকৌশলী ও কে এম সহিদ উদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন পাইপ লাইনের ত্রুটির কারণে ওয়াসার পানি দূষিত হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি আমলে নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা জুরাইনবাসীর সমস্যা সমাধানে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

জুরাইনবাসী যে দুর্নীতির অভিযোগ আনছেন তা সঠিক কিনা জানতে চাইলে মন্তব্য করতে রাজি হননি এ কর্মকর্তা। প্রসঙ্গত, ১৭ এপ্রিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পক্ষ থেকে ‘ঢাকা ওয়াসা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে ওয়াসায় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি উল্লেখ করে টিআইবি।

এতে বলা হয়, ঢাকা ওয়াসার পানির নিম্নমানের কারণে ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি পানের উপযোগী করেন। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে বা সিদ্ধ করে পান করেন। গৃহস্থালি পর্যায়ে পানি ফুটিয়ে পানের উপযোগী করতে প্রতিবছর আনুমানিক ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাসের অপচয় হচ্ছে।

এ প্রতিবেদনের প্রতিবাদে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলন করে ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান বলেন, ‘ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় ও বিশুদ্ধ। একে ফুটিয়ে খাওয়ার প্রয়োজন হয় না।’ এ ছাড়া টিআইবির এই প্রতিবেদনকে তিনি নিম্নমানের বলে উল্লেখ করেন।

তাকসিম এ খানের এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। তারা নিরাপদ পানির দাবি করে আসছেন। এরই অংশ হিসেবে তারা মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) বেলা সোয়া ১১টায় কারওয়ান বাজারে অবস্থিত ওয়াসা ভবনের সামনে অবস্থান নেন।

বিডি২৪লাইভ

আমাদের মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

এই বিভাগের পোস্ট

Back to top button
Close