জানা অজানা

সাবধান! মার্কেটে শীতকালীন নকল প্রসাধনী

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মার্কেটে শীতকালীন নকল প্রসাধনী মজুদ ও বিক্রি শুরু হয়েছে। লোশন, ক্রিম, পেট্রলিয়াম জেলিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকার চকবাজারসহ কিছু এলাকায় গোপনে তৈরি করা হয়।

একই রকম দেখতে বোতলে ভরে এগুলো বিক্রির অপচেষ্টা করছে কিছু কারবারি। সম্প্রতি আসল পণ্য শনাক্তকারী অ্যাপ এবং র‌্যাবের অভিযানে বিষয়টি ধরা পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শীতের আগে লোশন, ক্রিম ও পেট্রলিয়াম জেলির চাহিদাকে পুঁজি করে অপকর্ম শুরু করে চক্র। তারা ভালো কম্পানির পণ্যের সঙ্গে নকল পণ্য ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সন্দেহ হওয়ায় কয়েকটি মার্কেটে ‘কিউআর অ্যান্ড বারকোড স্ক্যানার’ নামের অ্যাপ দিয়ে যাচাই করা হয়।

অনেক সময় পণ্যের বারকোড এলেও পণ্যটি উৎপাদনকারী কম্পানির নাম বা যাবতীয় তথ্য আসছে না। এই অ্যাপের মাধ্যমে পণ্যের লেবেলসহ সিল ঠিক আছে কি না তা বের করা যায় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, পণ্য নকল বলে সন্দেহ হলে যাচাই করে নিতে হবে। এর পরও সন্দেহ থাকলে বিএসটিআই ও র‌্যাবকে অবহিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী সুশীল ও তার বন্ধু শাকিল আহমেদ জানায়, তারা গত ৮ নভেম্বর রাজধানীর নিউ মার্কেটের ‘হোসেন স্টোর’ থেকে দুটি ভ্যাসলিন বডি লোশন কেনে। লোশন দুটি তাদের সামনেই ইনটেক পলি কাভার থেকে বের করে দেওয়া হয়।

বাসায় লোশনগুলো নেওয়ার পর তাদের এক ছোট ভাই তারেক মনোয়ার একটি লোশন ব্যবহার করে বলে, ‘লোশনটি নকল, চকবাজারের তৈরি!’ একপর্যায়ে তারেকের সঙ্গে বাজি ধরে সুশীল ও শাকিল।

তারেক তখন মোবাইলের প্লেস্টোরে গিয়ে ‘কিউআর অ্যান্ড বারকোড স্ক্যানার’ অ্যাপটি ডাউনলোড করে। অ্যাপটি দিয়ে বাসায় থাকা কয়েকটি পণ্যের বারকোড স্ক্যান করে।

এতে সব পণ্যের কম্পানির নামসহ ডিটেইল গুগলে চলে আসে। কিন্তু হোসেন স্টোর থেকে কেনা ভ্যাসলিন বডি লোশন স্ক্যান করলে কিছুই আসেনি। লোশনটি ইউনিলিভার কম্পানির নয়, নকল—তা মুহূর্তেই ধরে ফেলে তারা।

পরদিন তারা ভ্যাসলিন নিয়ে হোসেন স্টোরে যায় এবং দোকানের লোকজনকে তা স্ক্যান করে দেখায়। কিন্তু ভ্যাসলিনের বারকোড ও কম্পানির নাম দেখায়নি। তখন তারা বিদেশি কিছু পণ্যও স্ক্যান করে কম্পানির নামসহ ডিটেইল চলে আসার বিষয়টি দোকানের লোকদের দেখায়।

তখন হোসেন স্টোরের লোকজন তা অস্বীকার করে। এতে সুশীল ও শাকিলের প্রতিবাদের মুখে একপর্যায়ে নকল ভ্যাসলিন রেখে এর মূল্য ফেরত দেয় দোকানের লোকজন। বিষয়টি নিয়ে ওই দিনই ফেসবুকে একটি ‘সচেতনতামূলক’ স্ট্যাটাস দেয় সুশীল।

সে বলে, বিষয়টি নিয়ে হোসেন স্টোরের লোকদের সঙ্গে তর্কাতর্কি হয়। এমন সময় দোকানের একজন পণ্যগুলোর সেলসম্যানকে কল করে বিষয়টি বললে ওই সেলসম্যান বলে, বাংলাদেশি ভ্যাসলিনের কিউআর বারকোড নেই, থাকে না! সুশীলের ধারণা, ভ্যাসলিনটা চকবাজারের হবে।

♦ চকবাজার এলাকায় দেশীয়, এমনকি আন্তর্জাতিক মানের কম্পানির পণ্যও নকল করা হয়

♦ কম্পানির নাম, সিল, কৌটা—সব ঠিক থাকলেও ভেতরে রয়েছে ভেজাল পণ্য

♦ ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারখানা সিলগালা এবং জড়িতদের জেল-জরিমানা করলেও জামিনে বেরিয়ে একই কাজে যুক্ত হচ্ছে

জানতে চাইলে হোসেন স্টোরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলেন, ‘এমনটা হওয়ার কথা নয়। তার পরও কেন হলো বুঝতে পারছি না।’ দাবি করেন, ‘সরাসরি কম্পানির লোকজনের কাছ থেকে পণ্যগুলো সংগ্রহ করি।

এখন কম্পানির লোকজন পণ্য সরবরাহ করার সময় কিছু করে কি না!’ সুশীলের মতো গত সপ্তাহে আজিমপুর পাল হারবালের কাছে একটি দোকান থেকে একই কম্পানির একটি ভ্যাসলিন কেনেন দৈনিক ভোরের ডাকের সাংবাদিক ফজলুর রহমান।

পরে তিনি ভ্যাসলিনটি বাসায় নিয়ে কিউআর স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যান করেন। এতে একটি বারকোড এলেও গুগলে ‘প্রডাক্ট ওয়েব’ সার্চ দিলে ইংরেজিতে লেখা আসে, ‘ডু নট ম্যাচ দিস প্রডাক্ট অব এনি ডকুমেন্ট’।

অথচ বাসায় থাকা একই কম্পানির আরেকটি ভ্যাসলিন স্ক্যান করলে তাতে বারকোড ও কম্পানির যাবতীয় তথ্য চলে আসে। পরে ওই দোকানির কাছে যান সাংবাদিক ফজলু। এ সময় দোকানি মিন্টু তাঁকে বলেন, তিনিও পণ্যগুলো ইউনিলিভার কম্পানির লোকদের কাছ থেকে কেনেন!

গত ১৬ নভেম্বর ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকার ইউনিলিভার বাংলাদেশ কম্পানির সেলসম্যান সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর দেওয়া সব পণ্য ঠিক আছে। তাঁর কম্পানির পণ্য নকল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অনেক দোকানদার তাঁদের কম্পানির পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন দোকান বা স্থান থেকে পণ্য কিনে থাকেন। দোকানদাররা চকবাজার থেকে নকল পণ্য কিনে ভালো কম্পানির নামে অপপ্রচার চালায়।

কোথা থেকে পণ্য কেনেন—এমন প্রশ্ন করা হলে দোকানদার মিন্টু কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আসলে ভাই, আমরা তো অ্যানড্রয়েড ফোন ব্যবহার করি না। আসল না নকল তা বের করার পদ্ধতিও জানি না।’ তিনি অবশ্য সাংবাদিক ফজলুর ভ্যাসলিন কেনার টাকা ফেরত দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চকবাজার এলাকায় এমন কোনো পণ্য নেই যা নকল হয় না। দেশীয়, এমনকি আন্তর্জাতিক মানের কম্পানির পণ্যও নকল করা হয়। কম্পানির নাম, সিল, কৌটা—সব ঠিক থাকলেও ভেতরে রয়েছে ভেজাল পণ্য।

দেখে বোঝার উপায় নেই যে এসব ভেজাল হতে পারে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন সময় সেখানে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কারখানা সিলগালা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের জেল-জরিমানা করেছেন। কিন্তু জেল থেকে জামিনে বের হয়ে ফের একই কাজে যুক্ত হচ্ছে এদের কেউ কেউ।

গত ৯ অক্টোবর চকবাজারে র‌্যাব-১০ ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের নকল প্রসাধনী তৈরির পাঁচটি কারখানা ও আটটি গুদামের সন্ধান পায়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম এসব কারখানা ও গোডাউন বন্ধ করে দেন।

এ সময় নামকরা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫২ ধরনের নকল প্রসাধনপণ্য জব্দ করা হয়, যার মূল্য প্রায় চার কোটি টাকা। এই অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১১ ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এ ব্যাপারে র‌্যাব কর্মকর্তা সারওয়ার আলম বলেন, ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চকবাজারসহ বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালানো হয়। প্রায়ই নকল পণ্য জব্দ করা হয়।

এ বিষয়টি নিয়ে নজরদারি আছে। তবে ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে। সন্দেহ হলে র‌্যাব বা বিএসটিআইকে তথ্য দিতে পারেন।’ র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, চকবাজার এলাকায় নামি-দামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল পণ্য বানানোর জন্য চীন থেকেও আনা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মেশিন আর কাঁচামাল। সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে খালি চোখে বোঝা কঠিন কোনটা আসল আর কোনটা নকল পণ্য।

আমাদের মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

এই বিভাগের পোস্ট

Back to top button
Close