ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ১২টি আন্দোলন যা বিশ্ব ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছে

কথায় আছে, সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাঁকা করতে হয়, অর্থাৎ কোন কাজ সহজ ভাষায় না হলে প্রকাশ ভঙ্গি পরিবর্তন জরুরী হয়ে পরে। কিন্তু এই আঙ্গুল বাঁকিয়ে ঘি তোলা অথবা প্রকাশ ভঙ্গি পরিবর্তনের প্রসঙ্গ কেন আনা হল হঠাৎ? এই প্রসঙ্গে আসার কারণ হল, আমরা আজকে ইতিহাসের এমন কয়েকটি আঙ্গুল বাঁকানোর অর্থাৎ আন্দোলনের বিষয়ে জানবো যে ঘটনা না ঘটলে হয়ত আজকের পৃথিবীর চেহারা অন্যরকম হত। চলুন জেনে নেয়া যাক ইতিহাসের এমন ১২ টি আন্দোলনের ঘটনা যা পুরো পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে।

১. প্রটেস্টান রিফরমেশন, ১৫১৭-১৬৮৫: প্রটেস্টান রিফরমেশন এমন এক শাণিত স্মারকচিহ্ন যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কখনও কখনও আগুন জ্বালাতে কেবল আগুনের একটি কণাই যথেষ্ট। প্রটেস্টান রিফরমেশনের অগ্রদূত হিসেবে মার্টিন লুথার ব্যাপকভাবে সমাদৃত কারণ এই আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল তার হাত ধরেই। প্রটেস্টান রিফরমেশনের ফলে ক্যাথলিক চার্চের দাম্ভিকতা সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ হয় এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে ধর্মচর্চায় ভিন্নতা আসে। “৯৫ টি প্রবন্ধ” রূপে একজন ব্যক্তির দৃঢ় কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ নতুন এক ধর্মীয় দলের জন্ম দেয়।

২. বোস্টন টি পার্টি, ১৭৭৩: আমেরিকার ইতিহাসে নথিভুক্ত আন্দোলনের তালিকায় প্রথমদিকের আন্দোলন হিসেবে অন্যতম বোস্টন টি পার্টি। আমেরিকা যখন ১৩ টি ব্রিটিশ কলোনির অন্তর্ভুক্ত ছিল, তখন কাগজ, চা, রং ইত্যাদির মত আমদানিকৃত জিনিসপত্রে আরোপিত করের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এই করের পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য বোস্টন টি পার্টি আন্দোলনের শুরু হয়। ১৭৭৩ সালে কলোনির ৬০ জন লোক বোস্টন বন্দরে ভিড়ানো চা বাহী একটি ব্রিটিশ জাহাজে প্রবেশ করে ৩৪০ টি বাক্স পানিতে ফেলে দেয়। এই ঘটনার ফলে আমেরিকায় বিপ্লবের আগুন জলে ওঠে, যা পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

৩. বাস্টিলের তাণ্ডব, ১৭৮৯: ইতিহাসের অন্যতম ভয়ানক আন্দোলনের একটি হল ১৭৮৯ সালের জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া বাস্টিলের তাণ্ডব। কঠোর রাজতন্ত্রে অতিষ্ঠ হয়ে ফ্রান্সের সাধারণ জনগণ প্যারিসের পূর্ব দিকে অবস্থিত এক জেলখানায় আক্রমণ করে, যে আক্রমণ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ঘৃণার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এক ভয়ানক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে গভর্নরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এই আন্দোলন ফরাসি বিপ্লবের সূচনা চিহ্নিত করে যার ফলে ফ্রান্সে পরবর্তীতে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্রের প্রসার ঘটে। এখনও ফরাসিরা প্রতিবছর জুলাই মাসে বাস্টিল ডে পালন করে থাকে ।

৪. অ্যাবোলিশনিস্ট মুভমেন্ট, ১৮৩০-১৮৬৫: অ্যাবোলিশনিস্ট মুভমেন্ট বা বিলোপবাদ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বর্ণবাদ এবং দাসপ্রথা নির্মূল করা। এই আন্দোলনের সূচনা ঘটে ১৮৩০ সালে এবং আন্দোলনকারীরা প্রায় ৪০ বছর পর্যন্ত তাদের দাবিতে অটল থেকে আন্দোলন চালিয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা প্রতিনিয়ত রাজ্য, সরকার এবং জনগণের কাছ থেকে বাধা এবং বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে যার ফলে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। অবশেষে ১৮৬৫ সালে সংবিধানের ১৩ তম সংস্করণে দাসপ্রথা বাতিল করা হয়।

৫. নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলন, ১৯১৩: ১৯১৩ সালে, উড্রো উইলসন এর অভিষেকের দিন ৮০০০ জনের মিছিল, নয়টি ব্যান্ড, বিশটি ফ্লুট এবং চারটি অশ্বারোহী ব্রিগেড একসাথে নারীদের ভোটাধিকারের দাবিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে জড় হয়। ভোটাধিকারের জন্য এটিই ছিল প্রথম কোন আন্দোলন। যদিও এই আন্দোলনের ফল পেতে আন্দোলনকারীদের আরও ৭ বছর অপেক্ষা করতে হয়। ১৯২০ সালে ১৯ তম সংশোধনীতে নারীদের ভোটাধিকার যুক্ত হয়।

৬. মহাত্মা গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ, ১৯৩০: ভারত তখনও ব্রিটিশ ঔপনিবেশক শাসকের অধীনে। সে সময় ভারতীয়দের লবণ তৈরি বা বিক্রি করা আইনত নিষেধ ছিল। এ কারণে তারা তখন ব্রিটিশদের কাছে থেকে চড়া দামে লবণ কিনতে বাধ্য হত। মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশদের এহেন অযৌক্তিক আইন ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে দশ-বার জনকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর সাথের আন্দোলনকারীদের নিয়ে উপকূল অঞ্চলে চলে যান সামুদ্রিক লবণ তৈরি করার জন্য। এই আন্দোলনে গান্ধীর সাথে হাজার হাজার মানুষ যোগদান করে। ১৯২০-২২ সালের পর এই লবণ সত্যাগ্রহই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠিত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন।

৭. দ্য ওয়াশিংটন সিভিল রাইটস মুভমেন্ট, ১৯৬৩: আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতার মধ্যে অন্যতম বক্তৃতার বক্তা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। লিংকন মেমোরিয়ালে ২০,০০০ মানুষের সামনে দেয়া বক্তৃতায় বর্ণবাদের কারণে শ্বেতবর্ণের আমেরিকানদের মত আফ্রিকান আমেরিকানদের সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন এবং এই চর্চার বিরুদ্ধে কথা বলেন। ১৯৬৩ সালের এই বক্তব্যের পর মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র প্রেসিডেন্ট কেনেডির সাথে এই আইন সংশোধনের ব্যাপারে আলাপ করেন। শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলনের কারণে আফ্রিকান আমেরিকানরা ১৯৬৪ সালে নাগরিক অধিকার এবং ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার অর্জন করে।

৮. দি অ্যান্টি-ওয়ার মুভমেন্ট, ১৯৬৭-৭২: এই আন্দোলন ভিয়েতনাম যুদ্ধ থামাতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক থাকলেও এই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক গুরুত্ব নেহাতই কম নয়। মূলত ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে শুরু হলেও পরবর্তীতে এই আন্দোলনের মোড় ঘুরে ১৯৭১ সালে যখন প্রেসের সামনে দ্য পেন্টাগন পেপার গোপন তথ্য ফাঁস করে। পেন্টাগন পেপারে যুদ্ধ বিষয়ক প্রায় ৭০০০ পৃষ্ঠার তথ্য ছিল যেগুলো সরকার লুকানোর চেষ্টায় সক্রিয় ছিল। তথ্য লুকানোর কারণে সাধারণ জনগণ সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং সরকারের উপর থেকে তাদের আস্থার পিলার ভাংতে থাকে। এই আন্দোলনের ফলে জনগণের কাছে সত্য পৌঁছানোর বাহক হিসেবে প্রেসের গুরুত্ব প্রকাশিত হয়।

৯. দ্য মানডে ডেমনস্ট্রেশন, ১৯৮২-৮৯: ১৯৮২ সালে দেশে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন একজন জার্মান পাদ্রি প্রতি সোমবার সাপ্তাহিক প্রার্থনা সভার আয়োজন করতেন যা পরবর্তীতে আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়, যে আন্দোলন বার্লিন দেয়াল পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খুব শীঘ্রই, সব ধর্মের সব বয়সের মানুষ সাপ্তাহিক এই প্রার্থনা সভায় অংশগ্রহণ করা শুরু করে। ধীরে ধীরে এই সভার অংশগ্রহণকারী বাড়তে থাকে এবং জার্মান কর্মকর্তাদের হাজার প্রচেষ্টার পরও এই সভা থামেনি।

বার্লিন দেয়াল ভাঙ্গার ঠিক আগে আগে ১৯৮৯ সালের ৯ অক্টোবর সোমবারে প্রায় ৩০০,০০০ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী জড় হয়। বার্লিন দেয়ালের পতনের আগ পর্যন্ত প্রতি সোমবার আন্দোলনকারীরা জড় হয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে অবস্থান করতো। পরে ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর বার্লিন দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এবং অবশেষে পূর্ব এবং পশ্চিম জার্মানি পুনরায় মিলিত হয়।

১০. সমকামী অধিকার আদায় আন্দোলন, ১৯৯৩: ১৯৯৩ সালে ৮ লাখের বেশি মানুষ সমকামীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আমেরিকার ন্যাশনাল মলে অনুষ্ঠিত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এই আন্দোলনের দাবি ছিল এমন এক আইনের যাতে সমকামীদের কোন ভাবেই তাদের যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। এই আন্দোলনের আরেকটি দাবি ছিল এইডস রোগের উপর গবেষণার জন্য তহবিল বাড়ানো। এই আন্দোলনের ফলে সমকামীরা জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক স্বীকৃতি অর্জন করে। এই আন্দোলনের পর থেকে সমলিঙ্গ বিয়ে অনুমোদিত হয় এবং এইডস রোগের প্রতিকার বের করার গবেষণায় গতি আসে।

১১. ইউরোমেইডেন, নভেম্বর ২০১৩- ফেব্রুয়ারি ২০১৪: ইউক্রেনে ২০০৪ সালের অরেঞ্জ রেভল্যুশন এর পর কিভ মেইন স্কয়ার এ ২০১৩-১৪ সালে আরেকটি বিশাল আন্দোলন সংঘটিত হয়। ইউক্রেনিয়ান সরকার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হওয়ার চুক্তিপত্রে সাইন করতে অসম্মত হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে হাজার হাজার ইউক্রেনিয়ান রাস্তায় নামে। সরকারের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালানো হয় আর আন্দোলনকারীরা এই হামলার বিপরীতে টায়ার জালিয়ে প্রতিবাদ করে। আর এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ দেশটির পূর্বাঞ্চলে প্রো-রাশিয়ান এবং অ্যান্টি গভর্নমেন্ট দলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় যা আজ পর্যন্ত চলছে।

১২. আরব বসন্ত, ডিসেম্বর ২০১০- অক্টোবর ২০১৩: ২০১০ সালে তিউনিসিয়ায় শুরু এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরব বিশ্ব রাজনৈতিক বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহের রূপ অবলোকন করে। সম্ভবত তাহেরির স্কয়ারে ২০১১ সালে ঘটে যাওয়া আন্দোলনই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী যখন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ একসাথে হয়ে প্রধানমন্ত্রী মুবারককে পদত্যাগ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। আর পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে এই আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পরে উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য প্রাচ্যে।

আমাদের মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

এই বিভাগের পোস্ট

Back to top button
Close