অধিকার আদায়ে কতটা সফল শ্রমিকরা?

মহান মে দিবস আজ। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এদিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের রাজপথে বুকের রক্ত ঝরিয়েছিলেন শ্রমিকরা। তারই ১৩৩তম বার্ষিকী আজ। তাই এদিন এলেই চলে আসে শ্রমিকের অতীত ইতিহাসের কথা, চলে আসে অমানবিক অত্যাচার আর নির্যাতনের ইতিহাস। এই আন্দোলনের ফলেই শ্রমিক আজ পেয়েছে তাদের ৮ ঘণ্টা শ্রমের অধিকার। তাই আজ যথাযথ মর্যাদায় বিশ্বে পালিত হবে বিশ্ব শ্রমিক দিবস।

পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত শ্রেণী হলো শ্রমিক শ্রেণী। কৃষিক্ষেতে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছেন নারীরা। প্রত্যেকের কাজ ও কর্মঘন্টা সমান থাকলেও শুধু তফাৎ মজুরি। বছরের পর বছর এই বৈষম্য। তাতে কোনো আক্ষেপ নেই নারীদের। এই কম মজুরিই তাদের বেঁচে থাকার সম্বল। পরিবারে প্রতিনিয়ত অক্লান্ত পরিশ্রমের বাইরে সবখানেই সামলাতে হচ্ছে নারীদের। কৃষিকাজের ২১টি ধাপের মধ্যে ১৭টি ধাপে কাজ করছেন তারা। তৈরি পোশাক কারখানার প্রায় ৯০ শতাংশ নারী। কারুশিল্পে নারীর সংখ্যা ৩০ লাখ।

তবু্ও কাজের কোনো স্বীকৃতি মিলছে না তাদের। দেশের অর্থনীতিতে তাদের শ্রমের কোনো মূল্যায়ন নেই। কৃষিকাজে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে গ্রামে সমালোচনাও সইহে হয়। পাশাপাশি পুরুষদেরও যে তীর্যক মন্তব্য আছে, সেটি অস্বীকার করা যাবে না। বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সংসারের হাল ধরেছেন নারীরা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপ অনুযায়ী, নারীর মোট গৃহস্থালি শ্রম যোগ করলে তা অনেক দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের অর্ধেকের মতো হয়। তাদের অনেক কাজই অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে। তবে মে দিবস এলেই নারীর অধিকার নিয়ে সবাই সোচ্চার হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ও পুরুষ শ্রমিক সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমান। অথচ পরিবার-কর্মস্থল-সমাজ-রাষ্ট্র সর্বত্রই তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ বৈষম্য নারীর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।

নারীর শ্রমের মর্যাদা নিয়ে এমন প্রশ্নের মুখে প্রতিবছরের মতো এবারও সারা দেশে মহান মে দিবস পালিত হতে যাচ্ছে।

এ বছর বাংলাদেশে দিবসটির প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে- ‘শ্রমিক মালিক ভাই ভাই, সোনার বাংলা গড়তে চাই।’ দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সরকারিভাবে দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- মে দিবসের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সেমিনার।

সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম গণমাধ্যমকে বলেন, নারী-পুরুষের শ্রমমূল্যে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। আমাদের দেশের চাকরিদাতারা সব সময় চায় কত কম মজুরি দিয়ে শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো যায়। সমাজের দুর্বল অংশ নারীকে তারা বেশি বঞ্চিত করার সুযোগ পায়।

নারী শ্রমিকের নিচে আর কোনো সস্তা শ্রমিক পাওয়া যায় না। এমন বৈষম্য রুখতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হতে হবে জানিয়ে সেলিম আরও বলেন, শ্রমজীবী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তাদের অনেকে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। পাঁচ থেকে ১৭ বছরের বেশি গৃহশ্রমিক নামমাত্র বেতন এবং দুই বেলা খাবারের বিনিময়ে প্রায় ২০-২১ ঘণ্টা শ্রম দিয়ে যাচ্ছে।

তাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা। তারা সাপ্তাহিক ছুটিও পায় না। শিক্ষার অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।

বিলস সূত্র জানায়, ২০১৫-২০১৬ সালে ১৯০ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছে গৃহকর্মীদের ৭০ শতাংশের বেশি শিশু। বিদেশে যেসব বাঙালি নারী শ্রমিক গৃহশ্রমে কাজ করে, সেখানেও তাদের প্রতারণা ও বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অনেকে শারীরিক অত্যাচার, নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে আসছেন।

তৈরি পোশাক শিল্প খাতে চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান। এ খাতে আনুমানিক চার কোটি শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। বাংলাদেশে রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। এখানে মজুরিবৈষম্য ব্যাপক।

সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, ন্যূনতম বেতন ১৬ হাজার টাকা করার দাবিতে তারা মাঠে আছেন। চরম ঝুঁকির মধ্যে নারীরা কাজ করছেন। নারী নেত্রী নাজমা আরও বলেন, বেশির ভাগ নারী শ্রমিকই চুক্তিভিত্তিক কাজ করছেন। তাদের নিরাপত্তাও নেই।

তিনি বলেন, বর্তমানে একজন নারী শ্রমিকের যে ন্যূনতম মজুরি রয়েছে, তা দিয়ে তার সংসার কোনোক্রমেই চলে না। বাসাভাড়া দিতে গিয়েই নারী শ্রমিকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সমান কাজ করেও বেশির ভাগ নারী সমান মজুরি পান না। অধিকাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না থাকায় পোশাক শিল্পের নারীরা যখন-তখন ছাঁটাইয়ের শিকার হন।

কৃষি খাতের ৪৫ দশমিক ছয় শতাংশ কাজই নারীরা বিনামূল্যে করেন। কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। বর্তমানে কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে সাড়ে তিন শতাংশ।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, ‘সারাদেশে ২০১৮ সাল থেকে গত মার্চ পর্যন্ত মোট ৩৫২টি ট্রেড ইউনিয়নকে রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়েছে। শ্রমিক ভাই-বোনদের যেকোনো সমস্যা সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ, নিষ্পত্তি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে সার্বক্ষণিক টোল ফ্রি হেল্প লাইন (১৬৩৫৭) চালু করেছি। কারখানা, দোকান ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আনয়ন এবং কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করতে লেবার ইন্সপেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন (লিমা) চালু করেছি। শ্রম পরিদর্শকদের দেয়া ট্যাবে এই এ্যাপসটি ইনস্টলের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিদর্শন সংক্রান্ত যাবতীয় কাজে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

শ্রমিক দিবস যে কারণে পালন করা হয়:

মাঠে-ঘাটে, কলকারখানায় খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে রক্তঝরা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টির দিন। দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এদিন বুকের রক্ত ঝরিয়েছিলেন শ্রমিকরা।

এদিন শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পাঞ্চলে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। সে ডাকে শিকাগো শহরের তিন লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ বন্ধ রাখেন। শ্রমিক সমাবেশকে ঘিরে শিকাগো শহরের হে মার্কেট রূপ নেয় লাখো শ্রমিকের বিক্ষোভসমুদ্রে। এক লাখ ৮৫ হাজার নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে আরও বহু বিক্ষুব্ধ শ্রমিক লাল ঝাণ্ডা হাতে সমবেত হন সেখানে। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে পুলিশ শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে অন্তত ১০ শ্রমিক প্রাণ হারান।

হে মার্কেটের ওই শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। অবশেষে তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

গৃহশ্রমের স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ২৩নং ধারায় উল্লেখ আছে- কোনোরূপ বৈষম্য ছাড়া সব কাজের জন্য সমান বেতন পাওয়ার অধিকার আছে প্রত্যেকের। নারীরা কাজও করেন, রোজগারও করেন। তবু তারা অদৃশ্য, তাদের কোনো স্বীকৃতি নেই।

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম ও শ্রমিক:

শ্রম ও শ্রমিক পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শ্রম হলো, শারীরিক ও মানসিক কসরতের মাধ্যমে কোনো কাজ আঞ্জাম দেয়া। যিনি কাজটি আঞ্জাম দেন তিনি শ্রমিক এবং যে কাজটি সম্পন্ন করা হয় তা ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ বা উৎপাদন। পুঁজি, শ্রম ও এদের সংগঠনের মাধ্যমে মালিক যা আহরণ করে তা হলো উৎপন্ন দ্রব্য (ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ)। সাধারণত পুঁজিহীন মানুষ, যারা তাদের পুঁজি বিনিয়োগের উপায় না থাকায় নিজেদের গতর খেটে পেট চালান, তাদের শ্রমিক ও তাদের কাজকে শ্রম বলা হয়। শ্রমিক পুঁজিহীন, দরিদ্র শ্রেণীর লোক বলে তাদের মধ্যে কোনোরূপ লজ্জাকর অনুভূতি ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল কাজে ও হালাল পথে শ্রম বিনিয়োগ কিছুমাত্রও লজ্জার ব্যাপার নয়; বরং এ হচ্ছে নবী-রাসূলগণের সুন্নত। প্রত্যেক নবী-রাসূলই দৈহিক পরিশ্রম করে উপার্জন করেছেন বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।

উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করতে গিয়ে স্বয়ং মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তোমাদের সালাত শেষ হয়ে যাবে, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজক) অন্বেষণে ব্যাপৃত হয়ে যাও।’ (সূরা জুমা : ১০)।

আমাদের মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

এই বিভাগের পোস্ট

Back to top button
Close